সর্বকালের সেরা ফিনিশার মহেন্দ্র সিং ধোনি নাকি মাইকেল বেভান?

এসএমটুয়েন্টিফোর ডটটিভিঃক্রিকেটের যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে যুগে যুগে অনেক কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানের আগমন ঘটেছে। ডব্লিউ জি গ্রেস, ডন ব্র‍্যাডম্যান, জ্যাক হবস, গ্যারি সোবার্স, ভিভ রিচার্ডস হতে শুরু করে টেন্ডুলকার, লারা এবং কোহলিদের মতো কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানের দেখা পেয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব। কিন্তু তাদের মধ্যে সেরা কে? কিংবা সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান কে? এমন প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বোলারদের ক্ষেত্রেও এমন মতানৈক্য রয়েছে। আলাদা আলাদাভাবে প্রায় প্রতিটি বিভাগেই সর্বসেরা বের করা মুশকিল।
অন্যান্য ক্যাটাগরির মতো সর্বকালের সেরা ফিনিশার কে? এমন প্রশ্নের উত্তরেও সবাই একমত হতে পারেনি। ক্রিকেটে ফিনিশার রোল উদ্ভাবন করা অস্ট্রেলিয়ার মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান মাইকেল বেভানের অবসরের পর কিংবা তার সমসাময়িক বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার নামের পাশে ফিনিশার ট্যাগ বসাতে সক্ষম হয়েছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির। মাইকেল বেভান নাকি ধোনি। ফিনিশার হিসাবে সবচেয়ে বেশি সফল কে? এই প্রশ্নের উত্তরেও রয়েছে মতানৈক্য। 
ক্রিকেটে ‘ফিনিশার’ শব্দের স্রষ্টা মাইকেল বেভান এবং ম্যাচের শেষ সময়ে ফলাফল নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া মহেন্দ্র সিং ধোনির ওয়ানডে ক্যারিয়ারকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক, দুইজনের মধ্যে সেরার লড়াইয়ে কে এগিয়ে আছেন। বেভান এবং ধোনি দুইজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই যুগে। তাই তাদের মধ্যে পরিসংখ্যান অনুযায়ী তুলনা করলে নিখুঁত হবে না।
মাইকেল বেভানের ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক ঘটেছিল ১৯৯৪ সালের ১৪ই এপ্রিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছিলেন একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। অপরদিকে, মহেন্দ্র সিং ধোনির ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে। তিনি টেস্ট ক্রিকেটকে ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানালেও এখনও সীমিত ওভারের ক্রিকেটকে বিদায় জানাননি।
বেভান ওয়ানডে ক্রিকেট যখন খেলেছেন তখন ক্রিকেটে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা শুরু করেছিল। বোলার এবং ফিল্ডারদের জন্য তখন এত বাধাবিপত্তি ছিল না। পুরো ম্যাচ খেলা হতো একটি বলে। বর্তমানে খেলা হয় দুই প্রান্ত থেকে দু’টি নতুন বলে, যাতে করে বোলাররা ইনিংসের শেষদিকে রিভার্স সুইং আদায় করে নিতে পারেন।
বেভানের সময়ে ফিল্ড রেস্ট্রিকশন ছিল প্রথম ১৫ ওভারে, যা অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ম্যাথু হেইডেনরা যথাযথ ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে বর্তমানে শেষ দশ ওভারে ফিল্ড রেস্ট্রিকশন থাকার কারণে দ্রুত রান তোলার সুযোগ থাকে। বর্তমানে মাঠের আকার তুলনামূলক ছোট এবং ব্যাটের ওজন তুলনামূলক বেশি, যাতে করে ব্যাটসম্যানরা আগের তুলনায় বেশি বাউন্ডারি হাঁকাতে পারেন। তাই বাউন্ডারির সংখ্যা দিয়ে এবং দ্রুত রান তোলার দিকে ধোনি অনেক এগিয়ে আছেন।
মাইকেল বেভানের চেয়ে বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা ধোনি এখন পর্যন্ত ৩৫০টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন। এর মধ্যে ২৯৭ ইনিংস ব্যাটিং করে ১০টি শতক এবং ৭৩টি অর্ধশতকের সাহায্যে ৫০.৫৭ ব্যাটিং গড়ে ও ৮৭.৫৬ স্ট্রাইকরেটে ১০,৭৭৩ রান সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে, মাইকেল বেভান খেলেছেন ২৩২ ম্যাচ। তিনি ১৯৬ ইনিংস ব্যাট করে ৫৩.৫৮ ব্যাটিং গড়ে এবং ৭৪.১৬ স্ট্রাইকরেটে ৬,৯১২ রান সংগ্রহ করেছেন। ছয়টি শতক এবং ৪৬টি অর্ধশতকের সাহায্যে তিনি এই রান সংগ্রহ করেছেন। 
শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেওয়া ফিনিশারের প্রধান কাজ। দুইজনেই এই ভূমিকায় অসাধারণ ছিলেন। মাইকেল বেভান মোট ৬৭ ইনিংসে অপরাজিত ছিলেন, যার মধ্যে ৫৩ ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়া জয় পেয়েছিল। অন্যদিকে, ধোনি ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ৮৪ ইনিংসে অপরাজিত ছিলেন, যার মধ্যে ৬৮ ম্যাচে জয়ের বিপরীতে মাত্র ১১ ম্যাচে পরাজিত হয়েছিল তার দল। রান তাড়ায় ধোনির রেকর্ড আরও ঈর্ষণীয়। তার অপরাজিত থাকা ৫০ ইনিংসের মধ্যে ভারত মাত্র দুই ম্যাচে পরাজিত হয়েছিল।
রান তাড়ায়, রানের চাপে পড়ে অনেক ভালো ব্যাটসম্যানও নিজের সেরাটা দিতে পারেন না। এদিক থেকে বেভান এবং ধোনি দুইজনই অসাধারণ। ধোনি খেলেছেন, এমন ১১৬ ম্যাচে ভারত পরে ব্যাটিং করে জয় পেয়েছে। এই ১১৬ ম্যাচের মধ্যে ৭৫ ইনিংস ব্যাটিং করে দু’টি শতক এবং ২০টি অর্ধশতকের সাহায্যে ১০২.৭১ ব্যাটিং গড়ে ও ৮৮.০০ স্ট্রাইকরেটে ২,৮৭৬ রান সংগ্রহ করেছেন। ক্যারিয়ারসেরা অপরাজিত ১৮৩ রানের ইনিংস খেলেছেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সফল রানতাড়ায়। ধোনির অভিষেকের আগে ভারত বহু ম্যাচে রান তাড়া করে সফলতার মুখ দেখতো না। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে ফিনিশারের অভাবে জয় বঞ্চিত হতো ভারত। তার আগমনের পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। ২০১১ সালের ফাইনালের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সফল রানতাড়ায় অপরাজিত ৯১ রানের ইনিংস ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলকে শেষ হাসি হাসিয়েছে তিনি।
ঠাণ্ডা মাথায় দলকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার চলন বেভানই চালু করেন। তিনি সফল রান তাড়ায় ৪৫ ইনিংস ব্যাটিং করে ২৫ ইনিংসেই অপরাজিত ছিলেন। তার ছয়টি শতকের মধ্যে তিনটি শতকই এসেছে রান তাড়া করতে নেমে। তিনি তার ক্যারিয়ারে এমন সব ইনিংস খেলে গিয়েছেন, যা অন্যান্য ব্যাটসম্যানদের জন্য ছিল কল্পনাতীত। বেশ কয়েকটি ম্যাচে দল যখন জয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছিল, সেখান থেকে দলকে জয় এনে দিয়েছিলেন বেভান। তিনি সফল রান তাড়ায় ৪৫ ইনিংসে তিনটি শতক এবং ১২টি অর্ধশতকের সাহায্যে ৮৬.২৫ ব্যাটিং গড়ে ১,৭২৫ রান সংগ্রহ করেছেন। রান তাড়া করতে নেমে অহেতুক নিজের উপর কিংবা দলের উপর বাড়তি চাপ তৈরি না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করতেন তিনি, যা তার স্ট্রাইক রেইটের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। প্রথম ইনিংসে ব্যাট করে জয় পাওয়া ম্যাচে তার স্ট্রাইকরেট ৮২.৭৯, অপরদিকে দ্বিতীয় ইনিংসে জয় পাওয়া ম্যাচগুলোতে তার স্ট্রাইকরেট ৬৬.৪২।
ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা দুই ফিনিশার বেভান এবং ধোনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দু’টি যুগে। বেভানের সময়কার ব্যাটসম্যানরা বেশিরভাগ রানের চাকা সচল রাখতো সিঙ্গেল-ডাবলের উপর, বর্তমানের ব্যাটসম্যানরা চার-ছয়ের দিকেই বেশি আগ্রহী। তাই চার-ছয়ের দিক দিয়ে বেভানের চেয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছেন ধোনি। বেভান তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ২১টি ছয় এবং ৪৫০টি চার হাঁকিয়েছেন। অপরদিকে, ২২৯টি ছয় এবং ৮২৬টি ছয় হাঁকান ধোনি। 
ফিনিশারদের শেষ দিকে বলের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রুত রান তুলতে হয়। বেভানের সময়কার বড় মাঠ এবং বোলিং-সহায়ক উইকেটে বেভান নিজের বেশিরভাগ রান তুলতেন দৌড়িয়ে। তাছাড়া, বর্তমানের মতো সেই সময়ে শেষের ওভারগুলোতে ফিল্ড রেস্ট্রিকশনও ছিল না। তাই বাউন্ডারির সংখ্যা দিয়ে দুইজনের তুলনা বেমানান। তবে ধোনি তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের জন্য সুপরিচিত ছিলেন।
দলের জয় পাওয়া ম্যাচে দুইজনের ভূমিকাই ছিল উল্লেখযোগ্য। তাদের শেষদিকের ব্যাটিংয়ের উপর নির্ভর করতো দলের জয়-পরাজয়। জয় পাওয়া ম্যাচে ধোনি ২০৫ ম্যাচের মধ্যে ১৬২ ইনিংস ব্যাট করে সাতটি শতক এবং ৪৪টি অর্ধশতকের সাহায্যে ৬৯.০০ ব্যাটিং গড়ে ও ৯৬.১৬ স্ট্রাইকরেটে ৬,৪৮৬ রান সংগ্রহ করেছেন। তবে পরে ব্যাটিং করে জয় পাওয়া ম্যাচে ধোনির গড় রীতিমতো ব্র্যাডম্যানীয়; ৭৫ ইনিংসে ১০২.৭১ গড়ে করেছেন ২,৮৭৬ রান!
জয় পাওয়া ম্যাচে বেভানের ব্যাটিং গড়ও ষাটের ঘরে। তিনি ১৫৫ ম্যাচের ১২২ ইনিংসে পাঁচটি শতক এবং ৩২টি অর্ধশতকের সাহায্যে ৬৫.২৪ ব্যাটিং গড়ে ৪,৫০২ রান সংগ্রহ করেছেন। তবে পরে ব্যাটিং করে জয় পাওয়া ম্যাচে সে গড় বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬.২৫, যেখানে ৪৫ ইনিংসে তার সংগ্রহ ১,৭২৫ রান। 
বেভান এবং ধোনি দুইজনই নিজেদের জায়গায় দুর্দান্ত ছিলেন। তাই কে এককভাবে সেরা ফিনিশার, তা নিয়ে মতানৈক্য থেকেই যায়। বেভান ছিলেন ক্রিকেটে ‘ফিনিশার’ টার্মের প্রবর্তক, তার দেখানো পদ্ধতিতেই অন্যরা সফলতা পাওয়া শুরু করে। তার আগে আর কোনো ব্যাটসম্যান আলাদাভাবে ফিনিশারের তকমা গায়ে মাখাতে পারেননি। ধোনির মতো বেভানের রানিং বিটুইন দ্য উইকেট ছিল চমৎকার। দুইজনেই লোয়ার মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান ছিলেন, এবং লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদেরকে চাপের মুখে ব্যাটিং করতে পারদর্শী ছিলেন। 
মাইকেল বেভান সফল রান তাড়ায় প্রথম অর্ধশত রানের ইনিংস খেলেন ১৯৯৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিডনিতে। এই ইনিংসের মধ্য দিয়ে বেভানের ফিনিশার হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিডনিতে অস্ট্রেলিয়া ১৭৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ৩৮ রানে ছয় উইকেট হারিয়ে বসে। সেখান থেকে লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদেরকে সাথে নিয়ে ৮৮ বলে অপরাজিত ৭৮ রানের ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়াকে শেষ বলে এক উইকেটের জয় এনে দেন তিনি।ধোনিও সফল রান তাড়ায় প্রথম অর্ধশত রানের ইনিংস খেলেন দলের বিপর্যয়ের মুখে। জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৫১ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ভারত মাত্র ৯১ রানে পাঁচ উইকেট হারালে ব্যাট করতে আসেন ধোনি। তারপর যুবরাজের সাথে জুটি বেঁধে অপরাজিত ৬৭ রানের ইনিংস খেলে দলের জয় নিশ্চিত করেন।দুইজনেই ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস খেলেছিলেন রান তাড়ায় ব্যাট করতে নেমে। ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কার দেওয়া ২৯৯ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ধোনি তিনে ব্যাট করতে নেমে ১৪৫ বলে অপরাজিত ১৮৩ রানের ইনিংস খেলেন। বেভান ২০০০ সালে শক্তিশালী এশিয়া একাদশের বিপক্ষে অস্বীকৃত ওয়ানডে ম্যাচে ৩২০ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে অপরাজিত ১৮৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার দল মাত্র এক রানে পরাজিত হলেও তার ইনিংসটি চাপের মুখে অন্যতম সেরা ইনিংস হিসাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।মতানৈক্য থাকলেও যদি একজনকে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে হয়তো বেশিরভাগ ভোটই পড়বে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সফলতা পাওয়া ধোনির পক্ষে। তিনি দলের প্রয়োজনে নিজের ব্যাটিং পজিশন নিচের দিকে নিয়ে এসে ফিনিশারের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। উপরের দিকে দুর্দান্ত ব্যাটিং করা সত্ত্বেও দলের প্রয়োজনে জন্য নিজেকে ফিনিশার হিসাবে তৈরি করেছিলেন। তাছাড়া শুধুমাত্র ব্যাটসম্যান হিসাবেই নন, অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষকের গুরু দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। তবে বেভানও যে ফিনিশার হিসেবে খুব একটা পিছিয়ে ছিলেন না, সেটা বলাই বাহুল্য। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *